ঘরের মেয়ে’র থেকে মুখ ফেরাল ভবানীপুর! সংগ্রামী জীবনে মমতা যেন ‘ট্র্যাজিক’ নায়িকা

​ভূমিকা:
রাজনীতি এক অদ্ভুত রঙ্গমঞ্চ, যেখানে উত্থান এবং পতন উভয়েই চরম নাটকীয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন কোনো সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়ে কম নয়। একসময়ের অদম্য নেত্রী, যাঁর একক জেদে এবং লড়াইয়ে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শক্ত ভিত ভেঙে পড়েছিল, আজ যেন তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের এক অন্যরকম এবং বিষণ্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। ভবানীপুর—যাকে তিনি চিরকাল নিজের ‘ঘর’ বলে মনে করেছেন, সেই ভবানীপুরই কি আজ ‘ঘরের মেয়ে’র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে? এই প্রশ্নই এখন রাজ্য রাজনীতির অলিগলিতে ঘুরপাক খাচ্ছে।
​ভবানীপুর ও মমতার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক
কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ভবানীপুর শুধুমাত্র একটি সাধারণ বিধানসভা কেন্দ্র নয়; এটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, তাঁর দুর্গ। এখান থেকেই তাঁর রাজনৈতিক আধিপত্যের চূড়ান্ত বিস্তার ঘটেছিল। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘দিদি’ এবং ভবানীপুরের স্নেহধন্য ‘ঘরের মেয়ে’। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সমীকরণ, নির্বাচনী হাওয়া এবং জনমতের প্রতিফলনে এমন কিছু নীরব ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যা এই দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কে এক অদৃশ্য দূরত্বের আভাস দেয়।
​সংগ্রামী জীবনের প্রেক্ষাপট: এক অক্লান্ত পথচলা
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবন বরাবরই কণ্টকাকীর্ণ। রাজপথের লড়াই থেকে শুরু করে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলন—সবখানেই তিনি ছিলেন এক জ্বলন্ত প্রতিবাদী মুখ। লাঠির ঘা, পুলিশি নির্যাতন, রাজনৈতিক আক্রমণ—কোনো কিছুই তাঁকে দমাতে পারেনি। বাংলার সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তিনি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। কিন্তু এত কিছুর পরও, এত লড়াইয়ের পর যখন নিজের সবচেয়ে আপন এবং সুরক্ষিত ঘাঁটিতে প্রত্যাখ্যানের সূক্ষ্ম সুর শোনা যায়, তখন তা রাজনীতির ময়দানে এক গভীর ট্র্যাজেডির জন্ম দেয়।
​কেন তিনি ‘ট্র্যাজিক’ নায়িকা?
সাহিত্যের বা নাটকের ট্র্যাজিক নায়িকারা সাধারণত প্রবল ক্ষমতাশালী, লড়াকু এবং জনপ্রিয় হন; কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে বা পরিস্থিতির ফেরে তাঁদের চরম হতাশা বা মানসিক দ্বন্দ্বের সম্মুখীন হতে হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই রূপ যেন সেই চিরায়ত সংজ্ঞার সাথেই মিলে যাচ্ছে। রাজ্যজুড়ে তাঁর দলের শাসন এবং প্রভাব থাকলেও, নিজের খাসতালুকে মানুষের এই মান-অভিমান বা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার গুঞ্জন তাঁকে এক রাজনৈতিক ‘ট্র্যাজিক’ নায়িকার রূপ দিয়েছে। যে আপামর জনতার জন্য তিনি জীবনভর সংগ্রাম করলেন, নিজের আরামের কথা ভাবলেন না, তাদেরই একাংশের এই নীরব প্রত্যাখ্যান তাঁর রাজনৈতিক মহাকাব্যে এক বিষণ্ণ অধ্যায় যুক্ত করেছে।
​উপসংহার
রাজনীতির জল কোন দিকে গড়াবে, তা নিশ্চিত করে বলা সবসময়ই কঠিন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অতীতে বহুবার ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রবল বিক্রমে উঠে এসেছেন। ভবানীপুরের এই বর্তমান পরিস্থিতি কি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের কোনো বিষণ্ণ পরিণতি, নাকি আরও একটি ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি—তা কেবল সময়ই বলবে। তবে আপাতত, বাংলার রাজনীতিতে ‘ঘরের মেয়ে’র এই ট্র্যাজিক রূপ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের জন্য এক গভীর আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

  • rgsamachar

    Related Posts

    ফুরিয়ে যাচ্ছে ‘ওয়াই’ ক্রোমোজোম, পৃথিবী থেকে কি মুছে যাবে পুরুষ জাতিই? বিজ্ঞান বলছে…

    ফুরিয়ে যাচ্ছে ‘ওয়াই’ ক্রোমোজোম, পৃথিবী থেকে কি মুছে যাবে পুরুষ জাতিই? বিজ্ঞান বলছে…জেনেটিসিস্ট জেনিফার এ মার্শাল গ্রেভসের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ১ কোটি ১০ লক্ষ বছর পরে পুরোপুরি মুছে…

    Read more

    কামারহাটি পুরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক, লকেট চট্টোপাধ্যায়ের ভাইকে নিয়ে প্রশ্নে সরব বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব

    কামারহাটি পুরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক, লকেট চট্টোপাধ্যায়ের ভাইকে নিয়ে প্রশ্নে সরব বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বনিজস্ব সংবাদদাতা:কামারহাটি পুরসভার নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচনকে ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। নির্দল কাউন্সিলর তথা…

    Read more

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    Exclusive

    ফুরিয়ে যাচ্ছে ‘ওয়াই’ ক্রোমোজোম, পৃথিবী থেকে কি মুছে যাবে পুরুষ জাতিই? বিজ্ঞান বলছে…

    কামারহাটি পুরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক, লকেট চট্টোপাধ্যায়ের ভাইকে নিয়ে প্রশ্নে সরব বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব

    জরুরি পরিস্থিতিতে একটাই নম্বর ১১২, পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছাবে পুলিশ! চালু হচ্ছে অত্যাধুনিক ইমার্জেন্সি রেসপন্স ব্যবস্থা

    চালু ‘দুর্গা সুরক্ষা স্কোয়াড’ ও ৫০০ থানায় ২৪ ঘণ্টার মহিলা হেল্পডেস্ক !

    DA নিয়ে বড় সুখবরপশ্চিমবঙ্গ সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীদের জন্য বড় সুখবর: DA বেড়ে ৩৮%DA নিয়ে বড় সুখবর

    অর্জুন সিংয়ের পাশে বসতেই দেখা গেল কৌশভ বাগচীকে, তারপরই অনুষ্ঠানের মাঝপথে প্রস্থান