বাংলায় শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার: সরকারি শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশন এবং অবক্ষয়ের রাজনীতি

বাংলায় শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার: সরকারি শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশন এবং অবক্ষয়ের রাজনীতি, তা পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার এক চরম সত্যকে সামনে এনেছে। সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশন পড়ানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং তা অমান্য করলে কঠোর শাস্তির নির্দেশ নতুন নয়, কিন্তু এর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন দীর্ঘদিনের। এবার রাজ্য শিক্ষা দফতর এবং কলকাতা হাইকোর্টের কড়া নজরদারির পর এই বিষয়ে ফের শোরগোল পড়ে গিয়েছে।

১. আইন কী বলছে এবং বাস্তব চিত্র কী?

শিক্ষার অধিকার আইন (RTE Act, 2009)-এর ২৮ নম্বর ধারা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করে যে, কোনো সরকারি বা সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের শিক্ষক কোনোভাবেই ব্যক্তিগত টিউশন বা কোচিং সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবেন না। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিজস্ব আচরণবিধিতেও (Service Rules) এটি কঠোর অপরাধ।
তা সত্ত্বেও বাস্তব চিত্রটা সম্পূর্ণ উল্টো। বাংলার শহর থেকে গ্রাম—প্রাইভেট টিউশন আজ একটা সমান্তরাল অর্থনীতি এবং রমরমা ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষকরা স্কুলে যতটা না মন দিয়ে পড়ান, তার চেয়ে অনেক বেশি এনার্জি ও সময় খরচ করেন নিজেদের ভোরের বা সন্ধ্যার প্রাইভেট ব্যাচে।

২. কেন এই প্রথা বাংলার গরিব ছাত্রদের শত্রু?

এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শিকার হলো সাধারণ এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারের ছেলেমেয়েরা।

  • বৈষম্যের সৃষ্টি: যে ছাত্রটি শিক্ষকের কাছে চড়া ফিস দিয়ে প্রাইভেট টিউশন পড়তে পারে, সে স্কুলেও বাড়তি সুবিধা বা প্রজেক্টে ভালো নম্বর পায়—এমন অভিযোগ হামেশাই ওঠে। আর যে গরিব ঘরের সন্তানটি শুধু স্কুলের ভরসায় থাকে, সে অবহেলার শিকার হয়।
  • স্কুলের ক্লাসরুমের গুরুত্ব হ্রাস: শিক্ষকরা যখন টিউশনকে মূল আয়ের বা মনঃসংযোগের জায়গা বানিয়ে ফেলেন, তখন স্কুলের ক্লাসরুমগুলো প্রাণহীন হয়ে পড়ে। ছাত্ররাও বোঝে স্কুলে গিয়ে লাভ নেই, আসল পড়াশোনা তো স্যারের বাড়িতে হবে।

৩. বেতন বনাম দায়বদ্ধতা

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের শিক্ষকরা যথেষ্ট সম্মানজনক এবং মোটা অঙ্কের বেতন পান। সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় এই বেতন দেওয়া হয় যাতে তাঁরা স্কুলের প্রতিটি শিশুকে সমানভাবে এবং নিখরচায় মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারেন। সরকারি কোষাগার থেকে মাইনে নেওয়ার পর আবার শিক্ষার ‘দোকান’ খুলে বসা নীতিগত এবং আইনি—উভয় দিক থেকেই অপরাধ।

৪. সমাধান কোন পথে?

শুধু চিঠি বা বিজ্ঞপ্তি জারি করে এই ব্যাধি দূর করা যাবে না। নির্দেশিকা তখনই সফল হবে যখন:

  • শিক্ষা দফতর প্রতিটি জেলায় নিয়মিত সারপ্রাইজ ভিজিট ও কড়া নজরদারি চালাবে।
  • সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে, যাতে তাঁরা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন।
  • দোষী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির (যেমন বেতন বন্ধ বা চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত) ব্যবস্থা করতে হবে।
  • rgsamachar

    Related Posts

    কামারহাটি পুরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক, লকেট চট্টোপাধ্যায়ের ভাইকে নিয়ে প্রশ্নে সরব বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব

    কামারহাটি পুরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক, লকেট চট্টোপাধ্যায়ের ভাইকে নিয়ে প্রশ্নে সরব বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বনিজস্ব সংবাদদাতা:কামারহাটি পুরসভার নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচনকে ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। নির্দল কাউন্সিলর তথা…

    Read more

    জরুরি পরিস্থিতিতে একটাই নম্বর ১১২, পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছাবে পুলিশ! চালু হচ্ছে অত্যাধুনিক ইমার্জেন্সি রেসপন্স ব্যবস্থা

    জরুরি পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের কাছে দ্রুত পুলিশি সহায়তা পৌঁছে দিতে বড় পদক্ষেপ নিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। রাজ্যজুড়ে ধাপে ধাপে চালু করা হচ্ছে একীভূত জরুরি পরিষেবা (Emergency Response Support System – ERSS)।…

    Read more

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    Exclusive

    কামারহাটি পুরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক, লকেট চট্টোপাধ্যায়ের ভাইকে নিয়ে প্রশ্নে সরব বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব

    জরুরি পরিস্থিতিতে একটাই নম্বর ১১২, পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছাবে পুলিশ! চালু হচ্ছে অত্যাধুনিক ইমার্জেন্সি রেসপন্স ব্যবস্থা

    চালু ‘দুর্গা সুরক্ষা স্কোয়াড’ ও ৫০০ থানায় ২৪ ঘণ্টার মহিলা হেল্পডেস্ক !

    DA নিয়ে বড় সুখবরপশ্চিমবঙ্গ সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীদের জন্য বড় সুখবর: DA বেড়ে ৩৮%DA নিয়ে বড় সুখবর

    অর্জুন সিংয়ের পাশে বসতেই দেখা গেল কৌশভ বাগচীকে, তারপরই অনুষ্ঠানের মাঝপথে প্রস্থান

    “নামাজ পড়তে পাকিস্তান–বাংলাদেশ যান” মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক, পাল্টা জবাব নওশাদ সিদ্দিকীর