
বরানগর: রাজ্যে সিন্ডিকেট রাজ, তোলাবাজি এবং দাদাগিরির বিরুদ্ধে প্রশাসনের কড়া বার্তার মাঝেই উত্তর ২৪ পরগনার বরানগরে ঘটল এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। এক মহিলাকে মারধর, শ্লীলতাহানি এবং সোনার গয়না ছিনতাইয়ের (ছিনতাই) গুরুতর অভিযোগে বরানগরের প্রভাবশালী তৃণমূল (INTTUC) নেতা শঙ্কর রাউত এবং তাঁর চার ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে গ্রেফতার করল ব্যারাকপুর কমিশনারেটের পুলিশ।
ধৃত বাকি চার অভিযুক্তের নাম— অর্পণ দত্ত, দেবজ্যোতি বণিক, দেবাশিস দাস এবং সুবল দে। এই গ্রেফতারিকে কেন্দ্র করে শনিবার দিনভর বরানগর থানা এবং বনহুগলি চত্বর রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। প্রশাসনের তরফে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, অপরাধী যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, আইন আইনের পথেই চলবে।
ঘটনার নেপথ্যে: তোলাবাজি ও রাতের অন্ধকারে মহিলার ওপর হামলা
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার রাতে বরানগরের বনহুগলি এলাকায়। অভিযোগ, শঙ্কর রাউতের অনুগামী কয়েকজন যুবক ওই এলাকার এক মহিলার কাছে মোটা অঙ্কের টাকা তোলা (কাটমানি) দাবি করে। ওই মহিলা এবং তাঁর পরিবার এই অন্যায় দাবি মানতে অস্বীকার করলে বচসা শুরু হয়।
অভিযোগ, বচসা চলাকালীন অভিযুক্তরা ওই মহিলার ওপর চড়াও হয়। আগ্নেয়াস্ত্রের বাঁট দিয়ে তাঁকে মারধর করা হয় এবং শ্লীলতাহানি করা হয় বলে আক্রান্ত মহিলার পরিবারের দাবি। শুধু তাই নয়, মহিলার গলার সোনার চেনও ছিনতাই করার চেষ্টা চালায় অভিযুক্তরা। মহিলার চিৎকার শুনে আশেপাশের প্রতিবেশীরা ছুটে এলে পরিস্থিতি বিগড়ে যায়।
উত্তেজিত জনতার গণধোলাই ও “পুলিশ” স্টিকার লাগানো গাড়ির রহস্য
মহিলার ওপর হামলার ঘটনা চাক্ষুষ করে ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা। পালাবার আগেই শঙ্কর রাউতের ৩-৪ জন অনুগামীকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন উত্তেজিত জনতা। ঘটনাস্থলেই তাঁদের গণধোলাই দেওয়া শুরু হয়।
খবর পেয়ে নিজের অনুগামীদের বাঁচাতে রাতেই একটি বিলাসবহুল স্করপিও গাড়ি নিয়ে ঘটনাস্থলে হাজির হন স্বয়ং তৃণমূল নেতা শঙ্কর রাউত। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, নেতার ওই গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনে “Baranagar Police” লেখা একটি ভুয়ো স্টিকার লাগানো ছিল, যাতে রাস্তায় কোথাও তাঁকে আটকানো না হয়। শঙ্কর রাউত কোনোমতে উত্তেজিত জনতার হাত থেকে তাঁর রক্তাক্ত অনুগামীদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য বরানগর স্টেট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান।
হাসপাতাল চত্বর থেকে নাটকীয় গ্রেফতার
এদিকে আক্রান্ত মহিলার পরিবার সরাসরি বরানগর থানায় গিয়ে শঙ্কর রাউত ও তাঁর দলবলের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে বরানগর থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী রাতেই বরানগর স্টেট জেনারেল হাসপাতালে পৌঁছায়। হাসপাতাল চত্বর থেকেই শঙ্কর রাউত এবং তাঁর চার সহযোগীকে প্রথমে আটক করা হয়। এরপর দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর বয়ানে অসঙ্গতি মেলায় শনিবার সকালে তাঁদের প্রথাগতভাবে গ্রেফতার (Arrest) করে পুলিশ।
থানা চত্বরে তুমুল উত্তেজনা: জুতোপেটার চেষ্টা স্থানীয় মহিলাদের
শনিবার সকালে শঙ্কর রাউত সহ পাঁচ অভিযুক্তকে যখন বরানগর থানা থেকে বের করে আদালতে পেশ করার জন্য পুলিশের গাড়িতে তোলা হচ্ছিল, তখন থানা চত্বরে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এলাকার বহু সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে স্থানীয় মহিলারা থানার সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। অভিযুক্তদের কড়া শাস্তির দাবিতে স্লোগান উঠতে থাকে। ক্ষোভ এতটাই চরম আকার ধারণ করে যে, প্রিজন ভ্যানে তোলার সময় এক উত্তেজিত মহিলা নিজের চটি/জুতো উঁচিয়ে শঙ্কর রাউতকে মারার চেষ্টা করেন। মহিলাদের দাবি, “এই শঙ্কর রাউত দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব চালাচ্ছিল। এদের আজীবন জেলের ভেতর রাখা হোক।”
বিতর্কিত অতীত ও রাজনৈতিক মহলে শোরগোল
বরানগরের রাজনীতিতে শঙ্কর রাউতের দাপট নতুন কিছু নয়। এর আগেও একাধিকবার ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে হুমকি দেওয়া, প্রোমোটিংয়ে সিন্ডিকেট রাজ চালানো এবং মারধরের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
আগের বিতর্ক: গত ফেব্রুয়ারি মাসেও এক ইন্টেরিয়র ডিজাইনারকে মারধর এবং তাঁর থেকে টাকা চাওয়ার অভিযোগে শঙ্কর রাউতের নাম জড়িয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতি: সম্প্রতি রাজ্যে প্রশাসনিক স্তরে দুর্নীতি ও তোলাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নেওয়ার পর, এই গ্রেফতারি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে খবর, দলের নাম ভাঙিয়ে যারা এই ধরনের অপরাধমূলক কাজ করবে, দল বা সরকার তাদের পাশে দাঁড়াবে না।
পুলিশ জানিয়েছে, ধৃতদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-র তোলাবাজি, মারধর, অস্ত্র আইন এবং নারীর শ্লীলতাহানির একাধিক ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। ঘটনার পেছনে আর কারা জড়িত, তা জানতে তদন্ত প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
