
দরজায় কড়া নাড়ছে ডেঙ্গি। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে মঙ্গলবারই উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে বসছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এই পরিস্থিতিতে ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসা পরিকাঠামো সুনিশ্চিত করার প্রশ্নে পড়শি রাজ্য ওড়িশার দিকে তাকিয়ে বাংলা। ওষুধের ঘাটতি মেটাতে ভরসা উত্তরপ্রদেশ।
ডেঙ্গির সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি এখনও অধরা। উপসর্গের নিরিখে রোগীর শারীরিক পরিস্থিতি বিচার করে চিকিৎসা করা হয়। যার পরিভাষাগত নাম, সিম্পটোম্যাটিক ম্যানেজমেন্ট। এ ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতিতে নর্মাল স্যালাইন (এনএস), রিঙ্গার ল্যাকটেট (আরএল) এবং জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামলই মূল ওষুধ। রাজ্যের যে তিন সংস্থা এই সব ওষুধের জোগান দিত, ঘটনাচক্রে তাদের সকলকেই উৎপাদন বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোল! এই তিন সংস্থা হল, পশ্চিমবঙ্গ ফার্মাসিউটিক্যালস, ফার্মা ইমপেক্স এবং নিভি রেমিডিজ়
সাধারণ ভাবে বৃষ্টি বন্ধ হলেই ডেঙ্গির প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় নিজেই জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর—এই তিন মাস রাজ্যে ডেঙ্গির মরসুম। দুই গোত্রের মশা ডেঙ্গির জীবাণু বহন করে—এডিস ইজিপ্টাই এবং এডিস অ্যালবোপিক্টাস। এদের বংশবিস্তার রোধের সঙ্গে জড়িত সব পক্ষকে এ দিন স্বাস্থ্য ভবনের বৈঠকে ডেকেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বৈঠকে স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিকদের পাশাপাশি পুর ও নগরোন্নয়ন, সেচ, পরিবহণ দফতর, কলকাতা, হাওড়া পুরনিগম-সহ রাজ্যের ২১টি পুরসভার আধিকারিকদের থাকার কথা। ডেঙ্গির মূল ওষুধ সরবরাহে বাংলা যে ওড়িশা, উত্তরপ্রদেশের উপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, তা নিয়ে স্বাস্থ্য ভবনের তরফে একটি রিপোর্ট বৈঠকে পেশ করা হবে বলে খবর।
২০২৪ সালে কর্নাটকে প্রসূতি মৃত্যুর জেরে ‘পশ্চিমবঙ্গ ফার্মাসিউটিক্যালস’কে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। উত্তরবঙ্গের চোপড়ায় তাদের প্লান্ট পরিদর্শন করে ফ্লুইড উৎপাদন চলাকালীন জীবাণুমুক্তকরণের প্রক্রিয়ায় ত্রুটি দেখতে পায় রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোল। ১০ ডিসেম্বর তাদের উৎপাদন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই নির্দেশ এখনও বহাল।
যদিও তার পরেও ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে ওই সংস্থার ফ্লুইড ব্যবহারের কারণে প্রসূতি মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। সেই ঘটনায় রাজ্য রাজনীতিতে শোরগোল পড়েছিল। জানুয়ারিতেই স্বাস্থ্য দফতরের তরফে একটি নির্দেশিকা জারি করে পশ্চিমবঙ্গ ফার্মাসিউটিক্যালসের পরিবর্তে ফার্মা ইমপেক্সকে নর্মাল স্যালাইন, রিঙ্গার ল্যাকটেট সরবরাহের বরাত দেওয়া হয়। কিন্তু বারুইপুরে অবস্থিত সেই সংস্থার সামগ্রীর গুণমান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কেন্দ্রীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেন্ট্রাল ড্রাগ স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন (সিডিএসসিও), রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোলের যৌথ পরিদর্শনে তাদের উৎপাদন পদ্ধতিতে ২৬ রকমের বড় গলদ ধরা পড়ে। এর পরই সংস্থার বিরুদ্ধে জারি হয় উৎপাদন বন্ধের নির্দেশ। দুই সংস্থা নিষিদ্ধ হওয়ার পরে বরাত পেয়েছিল বেহালার নিভি রেমিডিজ়। স্বাস্থ্য দফতর সূত্রের খবর, সম্প্রতি সেই সংস্থাও রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোলের গুণমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি! সেখানেও উৎপাদন বন্ধের নির্দেশ জারি হয়েছে। বেহালার সংস্থাটি ফ্লুইডের পাশাপাশি সরকারকে প্যারাসিটামল ইনফিউশন সরবরাহ করত। তাতেও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের একটিমাত্র সংস্থাই এই মুহূর্তে সরকারকে প্যারাসিটামল ৬৫০ সরবরাহ করে, ডায়মন্ড ড্রাগস প্রাইভেট লিমিটেড।
স্বাস্থ্য ভবনের হিসেব বলছে, সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রতি বছর ৬ লক্ষ ইউনিট আরএল এবং ২ লক্ষ ইউনিট এনএস লাগে। প্যারাসিটামল ৬৫০ ট্যাবলেটের প্রয়োজন হয় আড়াই কোটি। প্যারাসিটামল ৫০০ ট্যাবলেট ১ কোটি হলেই চলে। প্যারাসিটামল ইনফিউশন দরকার হয় ৬ লক্ষ ইউনিটের মতো। ওড়িশার সংস্থাটি ইতিমধ্যে ১ লক্ষ ইউনিট ফ্লুইড সরবরাহ করেছে। উত্তরপ্রদেশের সংস্থাটিও ১০ দিনের মধ্যে এনএস, আরএল এবং প্যারাসিটামল ইনফিউশন সরবরাহ করবে বলে জানিয়েছে। এর পাশাপাশি, বেহালার সংস্থাটিও কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট জমা দিয়েছে। তাতে যদি ড্রাগ কন্ট্রোল ছাড়পত্র দেয়, তা হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলেই জানাচ্ছেন ওই আধিকারিক।
এ দিকে, ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে কলকাতা পুর এলাকায় চিকিৎসকদের পুরোপুরি পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সোমবার স্বাস্থ্য প্রশাসনের ডাকা একটি বৈঠকে আয়ুষ্মানের পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনার নথি যাচাইয়ের কাজেও পুর চিকিৎসকদের যুক্ত থাকার কথা বলা হয়েছে। বৈঠকে হাজির চিকিৎসকদের বক্তব্য, শহর কলকাতায় আয়ুষ্মান ভারতের উপভোক্তার সংখ্যা সাড়ে সাত লক্ষ। মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনার উপভোক্তা রয়েছেন অন্তত ১২ লক্ষ। “এই বিপুল সংখ্যক উপভোক্তার নথি যাচাইয়ের কাজ চিকিৎসকদের উপরে চাপলে ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে নজরদারির কাজ ব্যাহত হবে।’’ বক্তব্য কলকাতা পুরসভার এক চিকিৎসকের। জেলাস্তরে এই নথি যাচাইয়ের কাজ করছেন প্রশাসনিক আধিকারিকেরা। তা হলে কলকাতায় কেন এই কাজ চিকিৎসকদের দিয়ে করানো হবে সেই প্রশ্ন উঠেছে। মঙ্গলবার স্বাস্থ্যভবনের বৈঠকে এই প্রসঙ্গও উঠবে।
